‘প্রধানমন্ত্রী জনতাকে অকাতরে বাঁশ দিচ্ছেন’

'প্রধানমন্ত্রী জনতাকে অকাতরে বাঁশ দিচ্ছেন'
“… ‘প্রধানমন্ত্রী দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রত্যেকের কাছ থেকে একটি করে গাছ উপহার চেয়েছেন।’ (বাংলাদেশ বেতার, চট্টগ্রাম, সন্ধ্যা, ১৩.১১.১৯৭৩)।
প্রধানমন্ত্রী দেশের জনগণের কাছে গাছ উপহার চেয়েছেন। কিন্তু গাছের কোন তালিকা বা প্রায়রিটি লিস্ট তিনি দেননি। মনে হয় যে কোন রকমের গাছ উপহার পেলেই তিনি খুশি হন। বাঁশও এক জাতের গাছ। গাছের এক ভিন্ন বংশ। তাই বলে কেউ যেন মনে না করেন যে, তিনি বাঁশ দিলেও খুশি হবেন।
প্রধানমন্ত্রীর বাঁশের প্রয়োজন নাই। তার প্রয়োজন অন্য জাতের গাছ। এমন কি মাদার গাছও তিনি সানন্দে গ্রহণ করবেন। তার বাঁশের উদ্বৃত্ত স্টক রয়েছে। তিনি এক হাতে জনতার কাছ থেকে গাছ উপহার চাইছেন অপর হাতে তিনি জনতাকে অকাতরে বাঁশ দিচ্ছেন। (আমাদের দেশে ‘বাঁশ দেয়া’ কথাটা ‘ঘায়েল করা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়।) চালের মণ একশ বিশ টাকা – এক বাঁশ। এক খানা লুঙ্গি পঞ্চাশ টাকা – দুই বাঁশ। ডালের সের ছ’টাকা – তিন বাঁশ। পিঁয়াজের সের নয় টাকা (সব ঝাঁঝ দামে) – নয় বাঁশ। মরিচের সের দশ টাকা (সব ঝাল দামে) – দশ বাঁশ। চকচকে চোখ ঝলসানো তরবারির মতো ছুরি সুটকির সের পঁচিশ টাকা – পঁচিশ বাঁশ (ছোরাও মনে করতে পারেন।) আগের পনের টাকার একশ’ বাঁশের দাম এখন একশ’ টাকা – একশ’ বাঁশ। বাস্। সাবাশ। আকাশ কাঁদে, বাতাস কাঁদে, নিপীড়িত মানুষ কাঁদেরে। বাঙালীদের মুজিব বাইয়া চল নাওরে, ও মুজিব রে (চট্টগ্রাম বেতার – ৭.১২.১৯৭৩)। নাও সোনার হলেও ছই ও লগি বাঁশেরই। And so on. The great Bamboo called ‘High Price’ goes on.
প্রধানমন্ত্রীর বাঁশের প্রয়োজন নাই। তার প্রয়োজন অন্য জাতের গাছ। এমন কি মাদার গাছও তিনি সানন্দে গ্রহণ করবেন। তার বাঁশের উদ্বৃত্ত স্টক রয়েছে। তিনি এক হাতে জনতার কাছ থেকে গাছ উপহার চাইছেন অপর হাতে তিনি জনতাকে অকাতরে বাঁশ দিচ্ছেন। (আমাদের দেশে ‘বাঁশ দেয়া’ কথাটা ‘ঘায়েল করা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়।) চালের মণ একশ বিশ টাকা – এক বাঁশ। এক খানা লুঙ্গি পঞ্চাশ টাকা – দুই বাঁশ। ডালের সের ছ’টাকা – তিন বাঁশ। পিঁয়াজের সের নয় টাকা (সব ঝাঁঝ দামে) – নয় বাঁশ। মরিচের সের দশ টাকা (সব ঝাল দামে) – দশ বাঁশ। চকচকে চোখ ঝলসানো তরবারির মতো ছুরি সুটকির সের পঁচিশ টাকা – পঁচিশ বাঁশ (ছোরাও মনে করতে পারেন।) আগের পনের টাকার একশ’ বাঁশের দাম এখন একশ’ টাকা – একশ’ বাঁশ। বাস্। সাবাশ। আকাশ কাঁদে, বাতাস কাঁদে, নিপীড়িত মানুষ কাঁদেরে।
… এতদিন লোকে বলত, যাক বাবা, বঙ্গের একজন খাঁটি বন্ধু বলে প্রমাণ দেবার জন্য শেখ সাহেব অন্তত দুটো জিনিস সস্তা রেখেছেন – নুন আর খুন। (আসলে এ দেশে একটি জিনিসই বরাবর সস্তা রাখা হয়েছে। তা হলো মানুষের জীবন)। এরি মধ্যে পাঁচ আনা সেরের লবণ পাঁচ টাকা, কোথাও কোথাও আট টাকায় উঠে গেল। নিমকহারামি আর কাকে বলে। এ দেশের মানুষের শ্রেণীচেতনা অতীব দূর্বল। সেটাই হচ্ছে মূল সমস্যা। কিন্তু নিমকের দাম বাড়লে তারা সহজেই সরকারের নিমকহারামি ধরে ফেলে। নুরুল আমীনের আমলে নুনের দাম ষোল টাকায় ওঠায় নুরুল আমীন সরকার তথা মুসলিম লীগের পতন ঘটে। নুন জিনিসতা ক্ষার (Corrosive) কিনা। (‘ষোল টাকা সের দরে লবণ খাওয়াও, লীগ লীগ করি মিয়া গলা ফাটাও’)। মণ প্রতি আড়াই টাকা ট্যাক্স বসিয়ে আয়ুব তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের লবণ শিল্প ধ্বংস করার চক্রান্ত করে। এই নিমকহারামি তার পতনকে ত্বরান্বিত করে।
… সোনার বাংলার সোনার মানুষদের কাছে আমার বিনীত আরজ, বাঁশ দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে, বঙ্গের এই বন্ধুকে, জাতির এই নতুন পিতাকে কেউ যেন ভুল না বোঝেন। আসলে এক মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি আমাদের বাঁশ দিচ্ছেন। মার্কিনের সুপারিশে ভুট্টোর কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে ক্ষমতার মসনদে আরোহণ ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ উপলক্ষে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ঘোষনা করেন (অবশ্যই বজ্রকন্ঠে) : ভাইসব, আপনারা আমাকে সোনার বাংলা গড়ার জন্য তিনটা বছর সময় দিন। এই তিন বছর আপনারা আমার কাছে কিছুই চাইতে পারবেন না। তিন বছর পর আমি স্বাধীনতার ফল ঘরে ঘরে পৌঁছিয়ে দেব। (কাউকে দূরদুরান্ত থেকে গণভবনে এসে নিজ কাঁধে বয়ে স্বাধীনতার ফল বাড়ি নিয়ে যেতে হবে না)।
প্রধানমন্ত্রী কিছু চাইতে বারণ করেছেন (‘যদি বারণ কর তবে চাহিব না’)। অথচ কিছু না চাওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাদের বাঁশ দিচ্ছেন কেন? ১৯৫৬ সালে চালের পঁয়ত্রিশ টাকায় উঠলে চালের এই অগ্নিমূল্যের (!) বিরুদ্ধে ভুখা মিছিলে শেখ সাহেবই নেতৃত্ব প্রদান করেন। ফলে আবু হোসেন মন্ত্রিসভার পতন হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়। কেউ যেন মনে না করেন যে এক কালের আন্দোলনকারী হিসেবে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে মশাল মিছিল করার জন্য কিংবা চরম অরাজকতা ও রক্ষীবাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে তিতুমীর মডেলের ‘বাঁশের কেল্লা’ তৈরির জন্য শেখ সাহেব আমাদের এই বাঁশ উপহার দিচ্ছেন। নি:সন্দেহে এগুলোও মহৎ এবং দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক-সমাজতান্ত্রিক কাজ।
স্বাধীনতার ফল ধরেছে ঠিকই। তবে পাকতে তিন বছর সময় লাগছে। স্বাধীনতার ফল কলা নয় যে ধরার তিন মাসের মধ্যেই পেকে যাবে। পাঁচ পয়সার ডাক টিকিটে কাঁঠাল ধরেছে। গোড়ারটা বেশ বড়ো। এই সাইজের কাঁঠাল আগে পাঁচ টাকায় বিক্রি হতো। এখন বিক্রি হচ্ছে পঁয়ত্রিশ টাকায়। আগের জামানার সোজা একটা ভাল হালের বলদের দামই। স্বাধীনতার ফলে কাঁঠালের গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। কাঁঠালের ভেতর মুজিববাদ এর অমৃতের সঞ্চার হয়েছে। এই কারণেই এই অভাবনীয় মূল্যবৃদ্ধি। যারা পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাচ্ছে এহেন মূল্যবৃদ্ধিতে তাদের কিছু আসে যায় না। তবে বিনীত অনুরোধ ডাক টিকিটের এই কাঁঠালকে কেউ যেন স্বাধীনতার ফল বলে ভুল না করেন।
… হতাশ হয়ে লোকে তাস ধরে। যতক্ষণ তাস খেলায় মশগুল থাকা যায় অন্তত ততক্ষণ সংসার জ্বালা ভুলে থাকা যায়। তাই ‘দেশের ঘরে ঘরে যখন বুভুক্ষ মানুষের হাহাকার, অতি প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য দ্রব্য দুষ্প্রাপ্য, সরকারি কোষাগারে যখন বৈদেশিক মুদ্রার অকল্পনীয় অভাব, তখন বৈদেশিক মুদ্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের তাস আমদানি করা হয়েছে।’ (বঙ্গবার্তা – ১২. ১২. ১৯৭৩)।
সঙ্কট যতই বাড়বে তাস আমদানিও ততই বাড়বে। তাস আমদানি যত সহজ চাল আমদানি তত সহজ নয়। তা ছাড়া এই ভিখিরীর দেশ থেকে প্রতিবেশী আণবিক শক্তির অধিকারিণী, ‘মুক্তিসূর্য’ (!) উপাধিধারিণী, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ঝুলিওয়ালী ভিখিরিণীর দেশে (ঝুলিতে চাল নেই, আছে দুয়েকটা এটম বোমা) যে হারে চাল পাচার হয় সে হারে তাস পাচার হওয়ার আশঙ্কা নেই। কাজেই তুলনামুলক ভাবে চাল আমদানির চেয়ে তাস আমদানিই নিরাপদ।
… কিন্তু সরকার বাহাদুরের এই তাস আমদানি বুভুক্ষ জনতাকে বেজায় বিক্ষুব্ধ করেছে। তাসখেলার এই সরকারি আয়োজনকে তারা বৈদেশিক মুদ্রা এবং তাদের অদৃষ্ট নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বলেই মনে করছেন। তারা বলে বেড়াচ্ছেন, যে সরকার তাসকে ক্ষুধাজনিত হতাশা নিবারণের উপায় বলে মনে করে সে সরকার বিলম্বে হোক, অবিলম্বে হোক তাসের ঘরের মতোই ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য।
বাংলাদেশ ‘মগের মুল্লুকের’ পাশে অবস্থিত একটি দেশ। কিন্তু মগের মুল্লুকও এই ‘ঠগের মুল্লুক’ থেকে হাজার গুণে শ্রেয়। ‘ঠগের মুল্লুক’ কথাটা আমার বানানো নয়। লন্ডনের বিখ্যাত ‘ইকনমিস্ট’ পত্রিকায় বাংলাদেশ সম্পর্কে এক নিবন্ধের শিরোনাম হল ‘রুল অব থাগস’ (Rule of Thugs) ঠগের রাজত্ব। দেশে দেশে আমাদের কতইনা সুনাম জাহির হচ্ছে। বিদেশীরা আমাদের দেশকে কতইনা সুন্দর সুন্দর উপাধিতে ভূষিত করছে। আমাদের যশ সৌরভে ‘আজি দুনিয়া মাতোয়ারা’।
… দশ টাকা সের দরে মরিচ খেয়ে যে লেখা শুরু করেছিলাম একশ টাকা সের দরে মরিচ খেয়ে সে লেখা শেষ করলাম। যে গতিতে মরিচের দর বাড়ছে তাতে বোঝা যায়, ছাপা ও বাঁধাইর কাজ সুসম্পন্ন হয়ে পাঠকের কাছে যখন এ লেখা পৌঁছবে তখন মরিচের সের হবে দেড়শ’ টাকা। বিদেশী শোষকদের লেজুড়, লেজে আগুন, হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, রামরাজ্যে শিক্ষাপ্রাপ্ত এই নব্য হনুমানরা লঙ্কা নিয়ে এক নতুন লঙ্কাকান্ড রচনা করে চলেছে। একাত্তরের সতেরই ডিসেম্বর প্রভাত সূর্য উদয়কালে মরিচের সের ছিল মাত্র আড়াই টাকা। আর এখন? ছটাক সাত টাকা। (ভেজাল সমাজতন্ত্রের মহিমায় তাতেও লাল ইটের গুঁড়ো মেশানো)। এয়া সোবহানাল্লাহ ! এয়া রাহমান ! মুজিবর রহমান তো দেশের জন্য “মুছিবতর রহমান” হয়ে গেল। এই আমাদের বরাত ! (শবেবরাত, ২রাসেপ্টেম্বর্, ১৯৭৪)॥”
অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদ 
রচনা সমগ্র - ২
মীরা প্রকাশন - ফেব্রুয়ারি - ২০০৪ । পৃ: ২৬৭-২৯৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *